স্বাস্থ্যমন্ত্রীর ভাবখানা এমন যেন এডিস মশাদের প্রতিনিধির সাথে ফলপ্রসূ বৈঠক হয়েছে..!

স্টাফ রিপোর্টার:
কখন কোন পরিস্থিতিতে কী ধরনের পদক্ষেপ নিতে হয়, কী কথা বলতে হয়, সে সম্পর্কে আমাদের বোধবুদ্ধি বরাবরই কম, সেটা মানছি, কিন্তু গোটা জাতি যখন ডেঙ্গু নিয়ে আতঙ্কিত, তখন কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে পড়াকে যেমন মানা যায় না, তেমনি লাগামহীন আবোলতাবোল কথাও ঠিক হজম হয় না।

গত এক মাসের ভেতর ধীরে ধীরে ডেঙ্গু পরিস্থিতি ক্রমাগত খারাপের দিকে যাচ্ছে, আর আমরা ওষুধ কাজ করছে না, মেয়াদোত্তীর্ণ, নতুন ওষুধ কেনা দরকার ইত্যাদি তথ্য ও তত্ত্ব আবিষ্কার করছি। অথচ সময়টা ছিল তাৎক্ষণিক সিদ্ধান্ত নিয়ে কাজে ঝাঁপিয়ে পড়ার। আর কথা কম বলার।

স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালেক বলছেন, ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে, অল্পদিনের ভেতরেই নাকি ডেঙ্গু ‘ম্যানেজ’ হয়ে যাবে। ভাবখানা এমন এডিস মশাদের প্রতিনিধির সঙ্গে ফলপ্রসূ বৈঠক হয়েছে। পত্রিকার খবরে প্রকাশ ডেঙ্গুতে এরইমধ্যে মারা গেছে ৮৫ জন, আর গেলো জুলাইতে সব রেকর্ড ভেঙে হাসপাতালে ডেঙ্গু রোগী ভর্তির সংখ্যা ছিল ১৫ হাজার ৬৫০ জন।

ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের মেয়র আতিকুল ইসলাম বলেছেন, ‘ডেঙ্গুতে আক্রান্ত একটি রোগীর মৃত্যুও কাম্য নয়। আমরা চেষ্টা করছি, ভুল তো হতেই পারে। শিখতে গেলে ভুল হবে, তবে এক সময় ঠিক হবে। আমার সততার কোনও অভাব নেই। তবে অভিজ্ঞতার অভাব আছে।’ কথা হলো ডেঙ্গু কি এ বছরই প্রথম হলো বাংলাদেশে? দুনিয়ায় কি এই রোগ আগে কোথাও কখনও হয়নি?আসল কথা হলো আমরা সবসময়ই নিজেদের দায়িত্বে অবহেলা করি এবং একটি দায়িত্বশীল পদে বসে নিজেদের আখের গোছানোর কথা চিন্তা করি। 

বাস্তবতা হলো মশা মারার জন্য ওষুধ কেনা হলেও সেসব কেনাকাটায় দুর্নীতি থাকে বলে—‘ভেজাল ওষুধ এলো, না মেয়াদোত্তীর্ণ ওষুধ এলো’ সেটা নিয়ে যেমন কেউ মাথা ঘামায় না, ওষুধগুলো সঠিকভাবে ছিটানো হলো কিনা, তা নিয়েও কারও কোনও মাথা ব্যথা থাকে না। অথচ আমরা গণমাধ্যম থেকে জানি, ২০১৮-১৯ অর্থবছরে উত্তর সিটি করপোরেশন মশকনিধনে ১৪ কোটি টাকার ওষুধ কিনেছে, আর দক্ষিণ সিটি ওষুধ কিনতে ব্যয় করেছে ১৭ কোটি ৩৯ লাখ টাকা। সেসব ওষুধ যে কার্যকরী নয়, সেটি প্রমাণিত হয়েছে এরইমধ্যে।

তারপরও পুরনো সেসব অকার্যকর ওষুধই ছিটিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে দুই সিটি করপোরেশন। এ যেন মশার মুখে ধোঁয়া নয়, মানুষের চোখে ধুলো দেওয়ার ঘটনা।

কেন পুরনো অকেজো ওষুধই ছিটানো হবে? কারণ হিসেবে বলা হচ্ছে, সময় লাগবে নতুন ওষুধ আনতে। নতুন ওষুধ কিনতে গেলে আগে তার নমুনা পরীক্ষা করতে হবে, নমুনা পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হলে আমদানির জন্য ঋণপত্র খুলতে হবে, এরপর আমদানি হলে সেসব ওষুধ আরেক দফা পরীক্ষা করা হবে, তারপর হাটে মাঠে ঘাটে ওষুধ ছিটানো হবে। এই চক্করে কেটে যাবে প্রায় এক মাস, আর ঝরে যাবে আরো প্রাণ।

এক্ষেত্রে প্রশ্ন জাগে ডেঙ্গু সম্পর্কে যদি আপনারা আগে থেকেই জানতেন, যেহেতু এক বছর আগেই ওষুধ কেনা হয়েছিল, তাহলে আজ এমন পরিস্থিতি কেন দাঁড়ালো? তাহলে কি আপনারা উদাসীন ছিলেন? যদি তাই থাকেন, তাহলে আপনার কতটুকু এ কাজের জন্য উপযোগী বা দক্ষ? 

ওদিকে, দক্ষিণের মেয়র মোহাম্মদ সাঈদ খোকন নিজে পোলো শার্ট পরে সাধারণ মানুষকে বলছিলেন, ‘আমরা যদি লম্বা পাঞ্জাবি পরি, পায়জামা পরি, পায়জামার সঙ্গে একটা মোজা পরি, তাহলে আমরা নিরাপদে থাকতে পারবো।’ মানে লম্বা জামাকাপড় পরলে আমাদের এডিস মশা কম কামড়াবে।

এসব নসিহত যখন তারা জনগণকে দেন, তখন জনগণ কি উল্টো প্রশ্ন করতে পারে না, আগের বছর যে কোটি কোটি টাকা খরচ করে ওষুধ কেনা হলো সেগুলো কাজ করলো না কেন? ডেঙ্গুর প্রকোপ বাড়তে পারে, বিশেষজ্ঞরা এমন সতর্কবাণী দেওয়ার পরও আপনারা কেন নাকে তেল দিয়ে ঘুমালেন? সভ্য দেশে এসব প্রশ্ন করার আগেই মেয়ররা লজ্জায় নিজেদের দায়িত্ব থেকে সরে দাঁড়ান। আমাদের দেশে আবার এসব প্রশ্ন সরাসরি কেউ জনপ্রতিনিধিদের করে না, কারণ জনগণই লজ্জায় অবনত থাকে।

শোনা যাচ্ছে কলকাতা থেকে বিশেষজ্ঞ আনা হবে ডেঙ্গু মোকাবিলা করার জন্য। অথচ আমরা জানি ডেঙ্গু মোকাবিলায় ভারত নয়, সফল হয়েছে অস্ট্রেলিয়া। সেখানকার টাউন্সভিল শহরে কিছু মশার শরীরে ওলবাকিয়া (Wolbachia) ব্যাকটেরিয়া প্রবেশ করিয়ে ছেড়ে দেওয়া হয়। তারা যখন স্থানীয় মশাদের সঙ্গে মিলিত হয়, তখন স্থানীয় মশাদের জনন প্রক্রিয়া নিয়ন্ত্রিত হয় এবং ডেঙ্গু, ম্যালেরিয়া ও জিকার মতো মরণব্যাধি ছড়ানো বন্ধ হয়। ২০১৪ সাল থেকে অস্ট্রেলিয়া ডেঙ্গুমুক্ত হয়েছে এই জৈব উপায়ে। ওষুধ ছিটিয়ে নয়। বিশ্বের এগারোটি দেশ এখন এই পদ্ধতি গ্রহণ করছে মশা নিয়ন্ত্রণে। আমাদের হাঁটা দরকার সেই পথে। বছর বছর যেন অকার্যকর ওষুধ কেনার নামে টাকাপয়সা লুট না হয় সেই ব্যবস্থা করতে হবে। 

ডেঙ্গু পরিস্থিতিকে জাতীয় সঙ্কট হিসেবে চিহ্নিত করে যত দ্রুত সম্ভব স্বল্পমেয়াদি ও দীর্ঘমেয়াদি কর্মপরিকল্পনা হাতে নিতে হবে। স্বল্পমেয়াদি পরিকল্পনা হিসেবে দ্রুত সময়ের ভেতর কার্যকরী ওষুধ আনার পাশাপাশি প্রত্যেক ওয়ার্ডে রাজনৈতিক ও সামাজিক কর্মীদের মাঠে নামিয়ে দিতে হবে, তারা কাজ করার পাশাপাশি জনসচেতনতা বাড়াবে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো কিছুদিনের জন্য বন্ধ রাখা যেতে পারে।

আর দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার অংশ হিসেবে অস্ট্রেলিয়ার মতো মশা দিয়ে মশা নিয়ন্ত্রণের পদ্ধতি গ্রহণ করতে হবে, মশার কয়েকটি প্রজননকালকে ধরে কাজ করলে বছর তিনেকের ভেতর এই ডেঙ্গু একেবারেই নির্মূল করা সম্ভব। অন্যরা পারলে আমরাও পারবো। দরকার রাজনৈতিক সততা, সদিচ্ছা ও নিষ্ঠার। যতদিন পর্যন্ত সরকারের দায়িত্বশীল পদ ব্যক্তির পকেট ভারি করার প্রকল্প থেকে মুক্ত না হবে ততদিন পর্যন্ত অবশ্য এসব সঙ্কট কাটবে না।
লেখক: প্রাবন্ধিক ও সাংবাদিক সূত্র বাংলা ট্রিবিউন