কাশ্মিরে দুর্বৃত্তের আচরণ করছে মোদি : অরুন্ধতী রায়

স্টাফ রিপোর্টার: জম্মু-কাশ্মিরকে সুবিশাল বন্দিশিবিরে রূপান্তর করা হয়েছে বলে মন্তব্য করেছেন স্বনামধন্য ভারতীয় বুদ্ধিজীবী অরুন্ধতী রায়। কাশ্মিরিদের সঙ্গে মোদি সরকার দুর্বৃত্তের আচরণ করছে বলে মন্তব্য করেছেন তিনি। ভারতের স্বাধীনতা দিবসে মার্কিন সংবাদমাধ্যম নিউ ইয়র্ক টাইমস-এ লেখা নিবন্ধে বুকারজয়ী এই উপন্যাসিক দাবি করেছেন, কাশ্মিরের স্বায়ত্তশাসন ক্ষুণ্ন করে কুরুচিপূর্ণ পন্থায় তা উদযাপন করছে ভারত। 

গত ৫ আগস্ট ভারতীয় সংবিধানের ৩৭০ অনুচ্ছেদ বাতিলের ঘোষণার মধ্য দিয়ে কাশ্মিরের স্বায়ত্তশাসনের অধিকার কেড়ে নেওয়া হয়। জম্মু-কাশ্মিরকে কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলে পরিণত করতে পার্লামেন্টে পাস হয় একটি বিলও। আর গত ৯ আগস্ট রাষ্ট্রপতির স্বাক্ষরের মধ্য দিয়ে আইনে পরিণত হয় তা।এই পদক্ষেপকে কেন্দ্র করে কাশ্মিরজুড়ে মোতায়েন করা হয়েছে বিপুলসংখ্যক অতিরিক্ত সেনা। ইন্টারনেট-মোবাইল পরিষেবা বন্ধ রাখা হয়েছে। গ্রেফতার করা হয়েছে সেখানকার বিপুলসংখ্যক স্বাধীনতাপন্থী ও ভারতপন্থী রাজনৈতিক নেতাকে।

১৫ আগস্ট ভারতের স্বাধীনতা দিবসে ‘নীরবতাই সবথেকে জোরালো আওয়াজ’ (The Silence Is the Loudest Sound) শিরোনামের নিবন্ধে অরুন্ধতী রায় লিখেছেন, ভারত যখন ব্রিটিশ শাসন থেকে স্বাধীনতা লাভের ৭৩ তম বর্ষপূর্তি উদযাপন করছে, তখন ছিন্নমূল শিশুরা দিল্লির রাস্তায় থমকে থাকা যানবাহনের পাশে গিয়ে গিয়ে বড় মাপের জাতীয় পতাকা ও স্যুভেনির বিক্রি করছে। সেগুলোতে লেখা ‘মেরা ভারত মহান হে’ (আমার ভারত মহান)। সত্যিকার অর্থে ‘আমার ভারত মহান’-এ কথাটা এ মুহূর্তে অনুভব করতে পারা কঠিন। কারণ আমাদের সরকারের কর্মকাণ্ড দেখে মনে হচ্ছে তারা যেন দুর্বৃত্তে পরিণত হয়েছে।

ভারতের সংবিধানে কাশ্মিরের স্বায়ত্তশাসনের যে নিশ্চয়তা ছিল, মোদি সরকার ৩৭০ ধারা বাতিল করার পর এর অন্তর্গত ৩৫-এ অনুচ্ছেদে বর্ণিত কাশ্মিরিদের বিশেষ সুবিধাও বাতিল হয়ে গেছে বলে মনে করা হচ্ছে। ‘৩৫-এ’ অনুযায়ী কাশ্মিরের বাসিন্দা নন এমন ভারতীয়দের সেখানে সম্পদের মালিক হওয়া ও চাকরি পাওয়ায় বাধা ছিল। সরকারের সিদ্ধান্তে সেই বাধা দূর হয়েছে। এখন চাইলেই যে কোনও ভারতীয় নাগরিক সেখান ভূমিসহ অন্যান্য সম্পদ কিনতে সক্ষম হবে।

নিবন্ধে অরুন্ধতী লিখেছেন, “ব্রিটিশ প্রথা অনুযায়ী টেবিল চাপড়ে আইনটি পাস হওয়াকে স্বাগত জানিয়েছে ভারতের পার্লামেন্ট। রাজ্যটির আইনি স্বীকৃতি বাতিল করার অর্থ হলো অনুচ্ছেদ ৩৫ (এ)ও বিলুপ্ত করা; এর আওতায় এতোদিন কাশ্মিরি বাসিন্দাদের অধিকারের স্বীকৃতি ছিল এবং নিজেদের এলাকার নিয়ন্ত্রণ তাদের হাতেই ছিল। সুতরাং ‘ব্যবসায়ের জন্য উন্মুক্ত হচ্ছে’ এ কথাটির মানে স্পষ্ট করতে হবে। এর সঙ্গে যুক্ত হতে পারে ইসরায়েলি ধাঁচের বসতি স্থাপন ও তিব্বতের ধাঁচে জনসংখ্যা স্থানান্তরের মতো বিষয়গুলোও।

স্বায়ত্তশাসন বাতিল করে কাশ্মিরকে দুটি আলাদা অঞ্চলে ভাগ করার পর উদ্ভূত পরিস্থিতিতে গত ৮ আগস্ট জাতির উদ্দেশে ভাষণ দেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। রেডিও,টেলিভিশনে এক যোগে সম্প্রচারিত ভাষণে কেন্দ্রীয় সরকারের সিদ্ধান্তকে ঐতিহাসিক আখ্যা দেন তিনি। বলেন, সংবিধানের ৩৭০ ধারা কাশ্মিরি জনগণকে স্বজনপ্রীতি,সন্ত্রাসবাদ ও বিভক্তি ছাড়া কিছুই দেয়নি। সংবিধানের ওই ধারা বাতিলের মধ্য দিয়ে কাশ্মির ও ভারতীয় জনগণের নতুন যুগের শুরু হবে বলে দাবি করেন মোদি। কাশ্মিরের পণ্য বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে যাবে বলেও দাবি করেন তিনি।

গত ৮ আগস্টের (এবারের অচলাবস্থার চতুর্থ দিন) কথা স্মরণ করে অরুন্ধতী লিখেছেন, ‘এদিন নরেন্দ্র মোদি মূলত উদযাপনমুখর ভারত ও অবরুদ্ধ কাশ্মির নিয়ে টেলিভিশনে ভাষণ দিয়েছিলেন। বক্তব্যে তিনি বুঝিয়েছিলেন কিভাবে কাশ্মিরে আবারও বলিউড চলচ্চিত্রের শ্যুটিং করা যাবে।ইন্টারনেট দুনিয়ায় বিভিন্ন নারী-বিদ্বেষী বক্তব্য এবং ‘কাশ্মির থেকে ভারতীয়রা এখন মেয়ে এনে বিয়ে করতে পারবে’-হরিয়ানার মুখ্যমন্ত্রী মনোহর লাল খাট্টারের এমন বিতর্কিত মন্তব্যসহ নানা কুরুচিপূর্ণ উপায়ে কাশ্মিরের স্বায়ত্তশাসন বাতিলের ঘোষণা উদযাপন করেছে ভারত। অরুন্ধতী মনে করেন, এসবের মধ্যেও সবচেয়ে বড় আওয়াজটি হলো কাশ্মিরে টহলকৃত ও ব্যারিকেডে ঘেরা রাস্তা এবং সেখানকার  অবরুদ্ধ, নির্যাতিত, কাঁটাতারে ঘেরা, ড্রোনের নজরদারিতে থাকা এবং পুরোপুরি যোগাযোগব্যবস্থা থেকে বিচ্ছিন্ন পরিস্থিতির মধ্যে বসবাসকারী প্রায় ৭০ লাখ কাশ্মিরির নিথর নীরবতা।

কাশ্মিরের পরিস্থিতি বিপজ্জনক, ভারতের একতরফা সিদ্ধান্ত চলবেনা: নিরাপত্তা পরিষদে চীন

স্টাফ রিপোর্টার: জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের রুদ্ধদ্বার বৈঠকে কাশ্মিরের চলমান পরিস্থিতি নিয়ে গভীর উদ্বেগের কথা জানিয়েছে চীন। শুক্রবার অনুষ্ঠিত বৈঠকে চীন কাশ্মির পরিস্থিতিকে ভয়াবহ ও বিপজ্জনক বলে উল্লেখ করেছে। চীনা কূটনীতিক নিরাপত্তা পরিষদকে জানিয়েছে, ভারত সরকারের এমন ধরনের একতরফা সিদ্ধান্ত ‘বৈধ নয়’। বৈঠক শেষে এক বিবৃতিতে এসব তথ্য জানিয়েছে চীন।

গত ৫ আগস্ট ভারতীয় সংবিধানের ৩৭০ অনুচ্ছেদ বাতিলের মধ্য দিয়ে কাশ্মিরের স্বায়ত্তশাসনের অধিকার ও বিশেষ মর্যাদা কেড়ে নেয় বিজেপি নেতৃত্বাধীন ভারতের কেন্দ্রীয় সরকার। লাদাখ ও কাশ্মিরকে দুটি পৃথক কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলে পরিণত করতে পার্লামেন্টে বিল আনা হয়। বিরোধীরা বিষয়টি নিয়ে সরব হলেও তাদের ঐক্যবদ্ধ বিরোধিতার অভাবে ভারতের লোকসভা ও রাজ্যসভা—দুই কক্ষেই পাস হয়ে যায় বিলটি।
জম্মু-কাশ্মিরের স্বায়ত্তশাসন ও বিশেষ অধিকার বাতিলে জাতিসংঘে বৈঠকের আবেদন করেছিল পাকিস্তান। কিন্তু এতে কাজ না হওয়ায় দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী শাহ মুহাম্মদ কুরেশি চিঠি দেন নিরাপত্তা পরিষদে। নিরাপত্তা পরিষদের সভাপতি জোয়ানা রোনেকাকে এই চিঠি দেন জাতিসংঘে নিযুক্ত পাকিস্তানের স্থায়ী প্রতিনিধি মালেহা লোদি। পরে কুরেশি সমর্থন আদায়ে চীন সফর করেন।

নিরাপত্তা পরিষদের এক কূটনীতিক জানান, বৈঠকটি রুদ্ধদ্বার হওয়ার কারণে পাকিস্তান ও ভারত তাতে অংশগ্রহণ করেনি। এই ধরনের বৈঠক সম্প্রচার বা সাংবাদিকদের প্রবেশ করতে দেওয়া হয় না।
এক সংবাদ সম্মেলনে চীন দাবি করে, সংবিধান সংশোধন করে ভারত সীমান্তে শান্তি বজায় রাখার দ্বিপক্ষীয় চুক্তি লঙ্ঘন করেছে। চীনা কূটনীতিক বলেন, এই মুহূর্তে কাশ্মিরের পরিস্থিতি বিপজ্জনক। কাশ্মিরের দীর্ঘদিনের অবস্থা ভারতের সংবিধান সংশোধনের মাধ্যমে পরিবর্তিত হয়ে গেছে।

ভারতকে কাশ্মির ইস্যুতে একতরফা সিদ্ধান্ত নেওয়া থেকে বিরত থাকার আহ্বান জানিয়ে চীনা কূটনীতিক বলেন, এমন একতরফা সিদ্ধান্ত গ্রহণ বৈধ নয়। বিষয়টি জাতিসংঘের চার্টার অনুসারে সমাধান হওয়া উচিত।
জাতিসংঘে নিযুক্ত পাকিস্তানের স্থায়ী প্রতিনিধি মালিহা লোদি নিরাপত্তা পরিষদে কাশ্মির ইস্যুতে বৈঠক আয়োজনকে স্বাগত জানিয়েছেন এবং বৈঠক আয়োজনে চীনের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেছেন। তিনি বলেন, আজ কাশ্মিরি মানুষের কথা শোনা হয়েছে। তারা একা না। জম্মু-কাশ্মিরের শান্তিপূর্ণ সমাধানে আমরা প্রস্তুত। এই বৈঠকে প্রমাণিত হয়েছে জম্মু-কাশ্মির ভারতের অভ্যন্তরীণ বিষয় নয়। চীনা দূত মানবাধিকার পরিস্থিতির ওপর গুরুত্বারোপ করেছে। এটাই একমাত্র ও শেষ পদক্ষেপ না।
সূত্র বাংলা ট্রিবিউন

কাশ্মিরের জম্মু এলাকা থেকে ১৪৪ ধারা প্রত্যাহার করা হয়েছে …!

স্টাফ রিপোর্টার:
ঈদ উল আজহা উদযাপনকে সামনে রেখে জম্মু-কাশ্মিরে অতিরিক্ত সেনা মোতায়েন করতে যাচ্ছে ভারতের নরেন্দ্র মোদি সরকার। ভারতীয় সংবাদমাধ্যম ইন্ডিয়া টুডে’র এক প্রতিবেদন থেকে এ আভাস মিলেছে। তবে লেহ ও জম্মু এলাকা থেকে ১৪৪ ধারা প্রত্যাহার করা হয়েছে। কড়া নিরাপত্তা ব্যবস্থার মধ্যে শনিবার (১০) খুলে দেওয়া হচ্ছে উপত্যকার সব স্কুল ও কলেজগুলো।

বুকারজয়ী ভারতীয় লেখক ও মানবাধিকারকর্মী অরুন্ধতী রায় কাশ্মিরকে দেখেন ‘একটি পরমাণু যুদ্ধ ক্ষেত্র এবং পৃথিবীর সবচেয়ে সামরিকীকরণকৃত এলাকা’ হিসেবে। সেই ২০১৩ সালে ‘আফজাল গুরুর ফাঁ সি ভারতীয় গণতন্ত্রের জন্য কলঙ্ক’ শীর্ষক নিবন্ধে তিনি বলেছিলেন,‘এখানে [কাশ্মিরে] রয়েছে ভারতের পাঁচ লাখ সৈনিক। প্রতি চারজন বেসামরিক নাগরিকের বিপরীতে একজন সৈন্য! আবু গারিবের আদলে এখানকার আর্মি ক্যাম্প ও টর্চার কেন্দ্রগুলোই কাশ্মিরিদের জন্য ধর্মনিরপেক্ষতা ও গণতন্ত্রের বার্তাবাহক।’

২০১৩ সালের পর আরও ৫ বছর পেরিয়ে গেছে। কাশ্মির সংকটের সমাধানে সেখানে সেনা-সংখ্যা আরও বাড়ানো হয়েছে। দমনপীড়নের পথেই হেঁটেছে ভারতীয় বাহিনী। এর সবশেষ সংযোজন হিসেবে কাশ্মিরের বিশেষ মর্যাদা কেড়ে নিয়ে তাকে কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলে রূপান্তর করেছে মোদি সরকার।

নতুন রাজনৈতিক পরিস্থিতির উত্থানে থমকে গেছে কাশ্মিরিদের জীবন। স্বায়ত্তশাসন হারিয়ে ভারতীয় সার্বভৌম রাষ্ট্রের আওতায় তাদের জীবনের অধিকার আগের থেকেও বেশি করে আটকে পড়েছে রাষ্ট্রীয় সেনা/নিরাপত্তা বাহিনীর সন্দেহের কারাগারে। 

ভারতীয় সংবাদমাধ্যম ইন্ডিয়া টুডে খবর দিয়েছে, ১২ আগস্ট (সোমবার) ঈদ উদযাপনকে সামনে রেখে উপত্যকায় আরও বেশি করে সেনা মোতায়েন করবে ভারত সরকার। তবুও থামছে না বিক্ষোভ। শুক্রবার (৯ আগস্ট) শ্রীনগরে কমপক্ষে ১০ হাজার বিক্ষোভকারীকে ঠেকাতে টিয়ার গ্যাস ও ছররা গুলি ছুড়েছে পুলিশ।

সোমবার (৫ আগস্ট) সংবিধানের ৩৭০ ধারা বাতিল করে ভারত সরকার কাশ্মিরের স্বায়ত্তশাসন কেড়ে নেওয়ার পর থেকে নতুন করে নজিরবিহীন ধরপাকড় চালাচ্ছে কর্তৃপক্ষ। বন্ধ রাখা হয়েছে ইন্টারনেট ও মোবাইল ফোন সংযোগ। চলাফেরায় কড়াকড়ি আরোপ করা হয়েছে। আটক রাখা হয়েছে কাশ্মিরি নেতাদের।

ইন্ডিয়া টুডে’র প্রতিবেদন অনুযায়ী, কাশ্মির উপত্যকায় যেকোনও পরিস্থিতি মোকাবিলায় প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি আগেই সম্পন্ন করে রেখেছে ভারতীয় বাহিনী। ৩৭০ ধারা বাতিলের ১০ দিন আগেই তারা ড্রো ন, মানবসম্পদ ও অন্যান্য সরঞ্জামাদি দিয়ে নিজেদের সমৃদ্ধ করে নিয়েছে।  সূত্র বাংলা ট্রিবিউন

৭০ বছর পর ভারত কাশ্মীরকে ধোঁকা দিয়েছে, কারফিউর ভেতর ফুসছে কাশ্মীরি জনতা

স্টাফ রিপোর্টার:
কাশ্মিরে সবশেষ বড় ধরনের ধরপা কড় অভিযান চালানো হয়েছিল ২০১৬ সালে; ভারতীয় নিরাপত্তা বাহিনীর হাতে জনপ্রিয় বিদ্রোহী নেতা বুরহান ওয়ানি নিহত হওয়ার পর। সে সময় কয়েক মাস ধরে কাশ্মিরে ভারতবিরোধী বিক্ষোভ হয়েছে, ধরপাকড় তখনও হয়েছে।

তবে এবার ভারতীয় বাহিনী কেবল বিদ্রোহীদেরকে গ্রেফতার করেই থামছে না; স্বায়ত্তশাসনপন্থী অবস্থানে থাকা ভারতপন্থী রাজনীতিকদেরও সমর্থকসহ গ্রেফতার করছে। মোদি সরকারের সাম্প্রতিক পদক্ষেপে কারফিউয়ের ভেতরেই ফুঁসছে সেখানকার জনসাধারণ। ভারতের সরাসরি শাসন মানতে নারাজ ‘বিশেষ মর্যাদা’ হারানো এই উপত্যকা। তবে পরিস্থিতিকে আড়াল করতে প্রবলভাবে ক্ষুণ্ন করা হচ্ছে সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা। চলাচলের ওপর বিধিনিষেধ ও যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন থাকায় পাশাপাশি তথ্য সংগ্রহ করতে বাধা দেওয়া হচ্ছে। সেখানে সাংবাদিকদের প্রবেশের অনুমতি দেওয়া হচ্ছে না।

এই পরিস্থিতিতে গত সোমবার থেকে কাশ্মিরের প্রধান শহর শ্রীনগরভিত্তিক অধিকাংশ ইংরেজি ও উর্দু ভাষার সংবাদপত্র প্রকাশিত হচ্ছে না। এ ঘটনায় হতাশ সাংবাদিকরা পরিস্থিতিকে ‘অভূতপূর্ব’ আখ্যা দিয়েছেন।

সোমবার (৫ আগস্ট) ভারতীয় সংবিধানের ৩৭০ অনুচ্ছেদ বাতিলের মধ্য দিয়ে কাশ্মিরের স্বায়ত্তশাসনের অধিকার কেড়ে নেওয়া হয়। এদিকে জম্মু-কাশ্মিরকে কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলে পরিণত করতে পার্লামেন্টে একটি বিলও পাস করা হয়েছে। স্থানীয়দের আশঙ্কা মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ অঞ্চলটির চেহারা এখন বদলে যাবে। কাশ্মিরের বিশেষ মর্যাদা বাতিল হওয়ায় ভারতীয়রা এখন অঞ্চলটিতে জায়গা কিনতে পারবে ও সরকারি চাকরি করতে পারবে। যা আগে সম্ভব ছিল না।

কাশ্মিরের বিশেষ মর্যাদা বাতিলের খবর ছড়িয়ে পড়ার সময় পুত্রবধূকে একটি মাতৃ সদনে নিয়ে যাচ্ছিলেন ৬৫ বছর বয়সী নবী খান। বিশেষ মর্যাদা বাতিল প্রসঙ্গে আল জাজিরাকে তিনি বলেন, ‘আমাদের বড় উদ্বেগের কারণ হলো এখন রাজ্য বহির্ভূত বিষযগুলো আমাদের ওপর কর্তৃত্ব করবে এবং আমাদেরকে শিগগিরই সংখ্যালঘুতে পরিণত করবে।’ শ্রীনগরের পার্শ্ববর্তী এলাকা আবি গুজারের বাসিন্দা সাফিয়া নবী।

৬৬ বছর বয়সী এ নারী আল জাজিরাকে বলেন, ছেলের মুখ থেকে কাশ্মিরের স্বায়ত্তশাসন বাতিলের কথা জানার পর থেকে তিনি অস্থির হয়ে আছেন। সাফিয়া বলেন, ‘পরিবারের জন্য রান্না করতে এবং তাদেরকে সহযোগিতা করতে আমি আমার চেহারা স্বাভাবিক রেখেছি। কিন্তু আমার হৃদয়ে কান্নার রোল বয়ে যাচ্ছে। আমরা রাস্তায় লড়াই করব, তারপরও আমাদের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতাকারী ভারতের শাসন মানব না।’

ব্যবসায়ী আহমেদ আল জাজিরাকে বলেন, ‘আমরা এবারের ঈদ উদযাপন করছি না। এ ঈদ শোকের। সুপরিকল্পিত ষড় যন্ত্রের আওতায় এ অঞ্চলের মুসলিমদেরকে সাজা দেওয়া হচ্ছে।’ ওয়াসিম ওয়ানি নামের আরেক ব্যবসায়ী মনে করেন, পশ্চিম তীরের মতো পরিস্থিতির দিকে এগিয়ে যাচ্ছে কাশ্মির।

তিনি বলেন, ‘গত চার দশক ধরে আমরা নৃ শংসতার মুখোমুখি হয়েছি। কিন্তু এখন আমরা আমাদের বাচ্চাদের ভবিষ্যত নিয়ে সত্যিকার অর্থে উদ্বিগ্ন। তাদের নপা জানি কিসের মুখোমুখি হতে হয়? যখনই আমি এসব নিয়ে ভাবি, তখন ফিলিস্তিনের শিশুদের ছবি আমার চোখে ভাসে এবং আমি কেঁদে ফেলি। ৭০ বছর পর ভারত আমাদের ধোঁ কা দিয়েছে। তবে আমরা কাশ্মিরকে আরেক ফিলিস্তিন হতে দেব না।’

মিডিয়ার ওপর কঠোর নিয়ন্ত্রণ আরোপ করা হয়েছে। জারি করা হয়েছে কারফিউ। বন্ধ রাখা হয়েছে ইন্টারনেট-মোবাইল পরিষেবা। বিরাজ করছে থমথমে পরিস্থিতি। এই পরিস্থিতিতে গত সোমবার থেকে কাশ্মিরের প্রধান শহর শ্রীনগরভিত্তিক অধিকাংশ ইংরেজি ও উর্দু ভাষার সংবাদপত্র প্রকাশিত হচ্ছে না। প্রতিবেদক মাতিন (ছদ্মনাম) বলেন, ‘আমি সেখানকার ঐতিহাসিক ক্লোক টাওয়ারের একটি ভিডিও ধারণ করতে বিখ্যাত লালচোক থেকে শ্রীনগর পর্যন্ত প্রায় চার কিলোমিটার হেঁটে যেতে সক্ষম হই। তবে কনসার্টিনা তার (এক ধরনের বাদ্যযন্ত্র) দিয়ে নিয়ন্ত্রিত এলাকায় আমাকে থামিয়ে দিয়েছিল সেনারা।

গতকাল (৮ আগস্ট, বৃহস্পতিবার) পর্যন্ত ইন্টারনেট ও টেলিফোন পরিষেবা কার্যত বন্ধ থাকায় সোমবার (৫ আগস্ট) থেকে সাংবাদিকরা তাদের সংবাদমাধ্যমের ওয়েবসাইটগুলোতে সংবাদ প্রকাশ করতে পারেননি। কাশ্মিরের বাইরের সংবাদমাধ্যমে কাজ করা স্থানীয় প্রতিনিধিরা ইউএসবি ড্রাইভের মাধ্যমে তাদের প্রতিবেদন ও ছবি পাঠিয়েছেন। অন্য সাংবাদিকরা নিরাপত্তাজনিত কড়াকড়ির বিষয়ে অভিযোগ করেছেন। তাদের কাজ বাধা দেওয়া হচ্ছে বলে জানিয়েছে।

মাতিন কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আল জাজিরাকে বলেন, ‘আমি কিছু ছবি ও ভিডিও নিতে চেষ্টা করেছিলাম। তবে দায়িত্বে নিয়োজিত বাহিনী আমাকে থামিয়ে দিয়েছিলো। তারা আমাকে আমার ক্যামেরা বন্ধ করতে অনুরোধ করেছিলো।’ তিনি বলেন, ‘আমি তাদেরকে বলেছিলাম, আমি রিপোর্টার, জবাবে তারা বলেছিলো, সবকিছু এখন শেষ, ফিরে যান।’

ভারতের টাইমস অব ইন্ডিয়ার লেখক ও কনসাল্টিং এডিটর সাগরিকা ঘোষ বলেছেন, ‘সাংবাদিকদের প্রবেশাধিকার বাধাগ্রস্ত করা ছাড়াও সমগ্র রাজ্য বন্ধ করে কাশ্মিরের জনগণকে অপমান করেছে সরকার।’

মঙ্গলবার (৬ আগস্ট) শ্রীনগর থেকে নয়া দিল্লি এসে সাংবাদিক মুজামিল জলিল ফেসবুকে লিখেছেন, গত দুই দিনের জন্য, দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসের রিপোর্টাররা তাদের নিজেদের অফিসে লুকিয়ে ছিলেন। সেখান থেকে আবাসস্থলে হেঁটে গেছেন এবং ফিরে এসেছেন। অফিসের নিজস্ব ভবনে বেশকিছু পুলিশ সদস্য আসে, করিডোরগুলিতে অস্থায়ীভাবে থাকে।’ তিনি লিখেছেন, ‘কাশ্মিরের ভিতরেই কাশ্মির অদৃশ্য হচ্ছে।’

আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের এক চিত্রসাংবাদিক বলেন, তিনি নগররীর অবরোধের চিত্র তুলে ধরতে সংবাদ সংগ্রহ করতে চেয়েছিলেন। তবে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী তার ক্যামেরা ভেঙে ফেলে এবং ওই এলাকা ত্যাগ করতে বলে। তিনি বলেন, সেখানে সংবাদমাধ্যমের জন্য পরিবেশ অনেক প্রতিকূল। এটা সংবাদমাধ্যমকে হত্যার সামিল। আমাদেরকে মানুষের কথা তুলে ধরার ক্ষেত্রে সর্বার্থে বাধা দেওয়া হয়েছে।’

ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অনুমতি নিয়ে এক সপ্তাহ আগে কাশ্মির পৌঁছেছেন এক বিদেশী সাংবাদিক। পুলিশ শনিবার (৪ আগস্ট) শ্রীনগর তার হোটেলে গিয়ে সেই মুহূর্তেই এলাকা ত্যাগ করতে বলেছে। তিনি বলেন, আমার এখানে অবস্থানের বিষয় পূর্বনির্ধারিত ছিলো। তবে জোরপূর্বক টিকিট কেটে বরিবার সকালে আমাকে স্থান ত্যাগ করতে বাধ্য করে তারা’।

স্থানীয় সংবাদ সংস্থায় কাজ করা সাংবাদিক সান্না এরশাদ মাত্তো বলেন, পরিস্থিতি দেখতে ও সংবাদ করতে গত মঙ্গলবার বাড়ি থেকে বের হয়েছি। বিভিন্ন চেকপোস্টে আমাকে বাধা দেওয়া হয়েছে। নিরাপত্তা বাহিনী স্পষ্ট করে বলেছিলো, কোনও সাংবাদিককে প্রবেশের অনুমতির আদেশ নেই। বাধা ও চেকপোস্টের কারণে আধা ঘণ্টারও বেশি সময় নিয়ে পাঁচ মিনিটের দূরত্ব অতিক্রম করতে পেরেছিলাম।’

মাত্তো বলেন, এটা ঠিক ২০০৬ সালের আন্দোলনের মতো নয়, তরুণ বিদ্রোহী বুরহান ওয়ানিকে হত্যার পর কাশ্মিরে শেষবারের মতো গণআন্দোলন দেখা গিয়েছিলো। যে আন্দোলনে ১০০ এর অধিক মারা যায়।

তিনি বলেন, ‘এই সময়ে মানুষদের থামাতে, বিশেষত সাংবাদিকদেরকে তাদের দায়িত্ব থেকে বিরত রাখতে সব ধরনের প্রচেষ্টা চালাচ্ছে ভারতীয় সরকার। আমরা অসহায়, এমনকি আমরা জানি না সেখানে কী ঘটছে। স্থানীয়দের জন্য এটা আরও খারাপ পরিস্থিতি। আমরা জানি না সেখানকার মানুষদেরকে হত্যা করা বা বন্দি করা হচ্ছে কিনা। সূত্র বাংলা ট্রিবিউন

কাশ্মিরকে ফিলিস্তিন বানাতে চাইছে মোদি

স্টাফ রিপোর্টার:ভারতের সংবিধানে কাশ্মিরের স্বায়ত্তশাসনের যে নিশ্চয়তা ছিল, মোদি সরকার ৩৭০ ধারা বাতিল করার পর এর অন্তর্গত ৩৫-এ অনুচ্ছেদে বর্ণিত কাশ্মিরিদের বিশেষ সুবিধাও বাতিল হয়ে গেছে বলে মনে করা হচ্ছে।

৩৫-এ’ অনুযায়ী কাশ্মিরের বাসিন্দা নন এমন ভারতীয়দের সেখানে সম্পদের মালিক হওয়া ও চাকরি পাওয়ায় বাধা ছিল। মোদি সরকারের সিদ্ধান্তে সেই বাধা দূর হয়েছে। এখন চাইলেই যে কোনও ভারতীয় নাগরিক সেখান ভূমিসহ অন্যান্য সম্পদ কিনতে সক্ষম হবে। বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, এই অনুচ্ছেদে বর্ণিত কাশ্মিরিদের বিশেষ সুবিধা অকার্যকর করার মধ্য দিয়ে মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ কাশ্মিরের জনসংখ্যাতাত্ত্বিক চরিত্রে পরিবর্তন আনতে চাইছে বিজেপি।

বিশ্লেষকরে মতে, মোদি সরকার আদতে কাশ্মিরে হিন্দু বসতি ও শিল্প গড়ে তোলার মধ্য দিয়ে সেখানকার সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলিম সম্প্রদায়কে হুমকির মুখে ঠেলে দিতে চাইছে। এই সিদ্ধান্তকে তাই ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডের প্রশ্নে ইসরায়েলি নীতির সঙ্গে তুলনা করছেন কেউ কেউ। তারা বলতে চাইছেন, কাশ্মিরকে ফিলিস্তিন বানানোর পায়তারা করছে হিন্দুত্ববাদী সরকার। ৩৭০ অনুচ্ছেদের অধীনে থাকা ৩৫-এ অনুচ্ছেদে বর্ণিত বিশেষ অধিকারের বদৌলতে এতোদিন ভূস্বর্গ বলে পরিচিত কাশ্মিরে ভারতের অন্যান্য অঞ্চলের অধিবাসীদের জমি বা সম্পত্তি কেনার সুযোগ ছিল না।

সেখানকার সব ধরনের সরকারি চাকরি বা ট্রেড লাইসেন্সও বরাদ্দ ছিল শুধুমাত্র রাজ্যের স্থায়ী বাসিন্দাদের জন্য। আর কাদের স্থায়ী বাসিন্দা বলা হবে, সেই কঠোর সংজ্ঞা নির্ধারণের ক্ষমতাও ছিল রাজ্য বিধানসভার হাতেই। তবে সোমবার (৫ আগস্ট) প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সঙ্গে সাক্ষাতের পর ৩৭০ অনুচ্ছেদ বাতিলের সিদ্ধান্ত ঘোষণা করেন দেশটির স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ। একইদিনে কাশ্মিরকে সরাসরি কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলে পরিণত করতে রাজ্যসভায় একটি বিলও পাস করা হয়।

মার্কিন সংবাদমাধ্যম সিএনএন-এর এক বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, সাধারণত এমন সাংবিধানিক পরিবর্তনের জন্য রাজ্যের স্থানীয় প্রশাসনের সঙ্গে সমঝোতার প্রয়োজন হয়। তবে জম্মু-কাশ্মিরে এখন কেন্দ্রীয় শাসন চলছে। গত জুনে মেহবুবা মুফতির পিডিসি নেতৃত্বাধীন জোট সরকার থেকে নিজেদের সমর্থন প্রত্যাহার করে বিজেপি। আর তখনই রাজ্যটি সরাসরি কেন্দ্রের শাসনাধীন হয়।

জহরলাল নেহেরু বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক হ্যাপিমন জ্যাকব সিএনএনকে বলেছেন, এই কেন্দ্রীয় শাসন জারির মধ্য দিয়েই জম্মু-কাশ্মিরের সুরক্ষাকবচ হিসেবে সংবিধানে থাকা ৩৭০ ধারা বাতিলের পথ করে নিয়েছে বিজেপি সরকার।জ্যাকব মনে করেন, যেভাবে প্রেসিডেন্সিয়াল ডিক্রির মধ্য দিয়ে ৩৭০ ধারার বিলোপ করা হয়েছে,  তার আইনত ভিত্তি দুর্বল। তিনি বলেন,’আদালতে এই আদেশ চ্যালেঞ্জের মুখে পড়বে, তবে আমার মনে হয় না বিজেপি সেটা নিয়ে চিন্তিত।যেনতেনভাবে তারা এই সিদ্ধান্ত বহাল রাখবে  এবং এই বাস্তবতা দীর্ঘ হবে।

এই দীর্ঘ সময়কে কাজে লাগিয়ে বিজেপি রাজ্যটাকে ব্যাপকভাবে বদলে ফেলার চেষ্টা করবে। এখন আইনত সেখানে কোনও বিরোধী নেই। কেবলমাত্র গভর্নর আছেন যিনি এই সিদ্ধান্তের বিরোধিতার এখতিয়ার রাখেন। তবে তিনি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় কর্তৃক নিয়োজিত।’৩৭০ অনুচ্ছেদ বাতিলের পাশাপাশি জম্মু-কাশ্মিরের প্রশাসনিক ব্যবস্থাকে রাজ্য থেকে কেন্দ্রীয় শাসিত অঞ্চলে পরিণত করার বিল পাস করেছে বিজেপি সরকার। ভারতীয় বিধি অনুযায়ী, স্থানীয় সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রে রাজ্য সরকারই গুরুত্বপূর্ণ কর্তৃপক্ষীয় ভূমিকা পালন করার এখতিয়ারভুক্ত। তবে কেন্দ্র শাসিত অঞ্চলে কেন্দ্রীয় সরকারই শাসনব্যবস্থার মূল নিয়ন্ত্রক। সোমবার কাশ্মিরকে কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলে পরিণত করতে একটি বিল ভারতের পার্লামেন্টের উচ্চকক্ষে পাস হয় এবং শিগগিরই এটি নিম্নকক্ষে তোলা হবে।

জ্যাকব বলেছেন,একটি রাজ্যকে কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলে পরিণত করার দৃষ্টান্ত নজিরবিহীন। তবে জম্মু-কাশ্মিরের রাজনীতির আমূল ও মৌলিক পরিবর্তন সত্যিই বিস্ময়কর। একবার একটি রাজ্য কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলে পরিণত হলে সেখানকার রাজ্যসভার আর সিদ্ধান্ত নেওয়ার মতো ক্ষমতা থাকে না।’বিগত সাধারণ নির্বাচনের আগে বিজেপি তাদের নির্বাচনী ইশতেহারেও সংবিধানের ৩৭০ ধারা ও আর্টিকল ৩৫এ বাতিল করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল। বিজেপির এক নির্বাচনি পোস্টার ছিল ‘আপকা সাহি ভোট কাশ্মিরমে আপকো প্লট দিলা সাকতা হ্যায়’। হিন্দি ভাষার ওই নির্বাচনি স্লোগানের অর্থটা হল, আপনি যদি ঠিকমতো ভোট দিয়ে (বিজেপিকে) জেতান, তাহলে আপনার কাশ্মিরে জমি কেনার স্বপ্নও সফল হবে।

সেই ধারা বিলুপ্ত হওয়ার পর এখন ভারতের অন্য অংশের নাগরিকরাও কাশ্মিরে গিয়ে জমি-বাড়ি কিনতে পারবেন। চাইলে টাটা বা বিড়লা শিল্পগোষ্ঠী জমি কিনে সেখানে কারখানাও গড়তে পারবে।  লন্ডন-ভিত্তিক জাস্টিস ফাউন্ডেশনের কর্ণধার অধ্যাপক শল বিবিসি বাংলাকে বলেছেন, “৩৭০ ধারা বিলোপের আগেই অন্তত দুটি পদক্ষেপ থেকেই পরিষ্কার আঁচ করা যাচ্ছিল বিজেপি সরকার কাশ্মীরের আবহমান কালের চরিত্রটা পাল্টে দিতে চাইছে। প্রথমত ভারতের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা অজিত ডোভাল কাশ্মিরের জন্য যে ‘ডোভাল ডকট্রিন’ প্রণয়ন করেছিলেন তার একটা গুরুত্বপূর্ণ প্রস্তাবনাই ছিল ভারতের অন্যান্য অংশ থেকে লোকজনকে কাশ্মিরে স্থানান্তর। সেই ডকট্রিনে কাশ্মিরে হিন্দু পন্ডিতদের জন্য আলাদা কলোনি স্থাপন, শিল্পাঞ্চলের জন্য বাকি ভারত থেকে শিল্পশ্রমিকদের এনে বসতি স্থাপন কিংবা ভারতীয় সেনার সাবেক সদস্যদের এনে জমি দেওয়ার কথাও বলা হয়েছিল।
 
বিজেপি সরকারের এই পদক্ষেপ অনুযায়ী, জম্মু-কাশ্মির রাজ্যের অংশ দূরবর্তী পার্বত্য অঞ্চল লাদাখ আলাদা হয়ে যাবে এবং কেন্দ্রীয় শাসিত পৃথক অঞ্চলে পরিণত হবে। ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম দ্য গার্ডিয়ানের খবরে বলা হয়েছে, কাশ্মিরিদের একটা বড় অংশ মনে করছে, মোদি সরকারের এই সিদ্ধান্ত মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ কাশ্মিরের বিদ্যমান জনমিতির সুরক্ষাকে হুমকির মুখে ফেলবে। সরকারের এক সূত্রকে উদ্ধৃত করে গার্ডিয়ানের খবরে বলা হয়েছে, কাশ্মিরের বিদ্যমান ভূমির মালিকানার নীতি সেখানকার উন্নয়নের পথে যে প্রতিবন্ধকতা আকারে হাজির ছিল, কাশ্মিরের বিশেষ অধিকার বাতিলের মধ্য দিয়ে সেই পথ প্রশস্ত হবে।  তবে লস অ্যাঞ্জেলস টাইমস-এর এক বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, বিশেষ অধিকার বাতিল হলে তুষারে আচ্ছাদিত এই পার্বত্য ভূস্বর্গে হিন্দু সেটেলারদের বসতি গড়ার পথ প্রশস্ত হবে, হ্রাস পাবে মুসলিম জনসংখ্যা। একে সমালোচকরা ফিলিস্তিনি ভূমিতে ইহুদি বসতি স্থাপনের অন্যায্যতার সঙ্গে তুলনা করছেন। মুসাদির আমিন নামের কাশ্মিরভিত্তিক একজন বিশ্লেষক ওই সংবাদমাধ্যমকে বলেছেন,’এই সিদ্ধান্তের উদ্দেশ্য কাশ্মিরের জনসংখ্যাতাত্ত্বিক অবস্থাকে বদলে দেওয়ার প্রচেষ্টা যা কেবল সংঘাতকেই আরও ত্বরান্বিত করবে’।

রুশ বংশোদ্ভূত মার্কিন বিশ্লেষক অ্যান্ড্রু কারিবকো বলছেন, যেমন করে ইসরায়েল ফিলিস্তিনি ভূমিতে অর্ধলক্ষ সেনা-সমাবেশ ঘটিয়েছে, সেখান কার্ফিউ জারির পাশাপাশি রাজনৈতিক নেতৃত্বকে ধারাবাহিকভাবে গ্রেফতার করার পাশাপাশি স্বায়ত্তশাসন কেড়ে নিয়েছে, গাজাকে পশ্চিমতীর থেকে পৃথক করে আলাদা প্রশাসনিক অঞ্চল বানিয়েছে, কাশ্মিরের ক্ষেত্রেও ভারত তাই করতে চলেছে। তার মতে, পশ্চিমতীরে যেমন করে অবৈধ ইসরায়েলি বসতি স্থাপনের বন্দোবস্ত করা হয়েছে, তেমনি করে কাশ্মিরেও হিন্দুত্ববাদীদের বসতি স্থাপনের সুযোগ করে দেওয়া হয়েছে। কারিপ্কো বলছেন, জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদ কর্তৃক স্বীকৃত ওই বিতর্কিত ভূমির জনসংখ্যাগত চরিত্র বদলে দেওয়ার পায়তারা করছে।

কাশ্মিরে কঠোর বিধিনিষেধ আরোপ, ইন্টারনেট বন্ধ..!

স্টাফ রিপোর্টার:
ভারত শাসিত কাশ্মিরের বাসিন্দাদের বিশেষ সাংবিধানিক অধিকার বাতিলের আশঙ্কার মধ্যে রাজ্যের বহু স্থানে বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে মোবাইল ইন্টারনেট, নিষিদ্ধ করা হয়েছে সভা-সমাবেশ। রবিবার রাত থেকে রাজ্যটির সাবেক মুখ্যমন্ত্রী মেহবুবা মুফতি ও ওমর আবদুল্লাহকে  গৃহবন্দি করে রেখেছে ভারতীয় কর্তৃপক্ষ। এছাড়াও নিজ বাড়িতে নজরদারির মধ্যে রয়েছেন সেখানকার আরেক প্রখ্যাত রাজনীতিবিদ সাজাদ লোন। সন্ত্রাসী হামলার আশঙ্কার কথা উল্লেখ করে গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান ও স্পর্শকাতর এলাকায় কঠোর বিধি-নিষেধ আরোপ করা হয়েছে।

সম্প্রচারমাধ্যম এনডিটিভি জানিয়েছে, সোমবার কাশ্মির ইস্যুতে মন্ত্রিসভার বৈঠক ডেকেছেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। গত শুক্রবার (২ আগস্ট) কেন্দ্রীয় সরকার সন্ত্রাসী হামলার বিষয়ে সতর্ক করার পর কাশ্মির থেকে দ্রুত তীর্থযাত্রী ও পর্যটকদের চলে যাওয়ার নির্দেশনা দেয় রাজ্য সরকার। এরপরই স্থানীয়দের মধ্যে ভীতি ছড়িয়ে পড়ে। কাশ্মির ছাড়তে শুরু করে হাজার হাজার পর্যটক ও তীর্থযাত্রী। কাশ্মিরের রাজনীতিবিদরা আশঙ্কা করতে থাকেন, সরকার ভারতীয় সংবিধানের ৩৫ (এ) ধারা বাতিল করতে যাচ্ছে। এই ধারার মাধ্যমে কাশ্মিরের জনগণকে চাকরি ও ভূমিতে বিশেষ অধিকার দেওয়া হয়েছে। তবে গভর্নর সত্য পাল মালিক তাদের জানিয়ে দেন, ৩৫ (এ) ধারা বাতিলের কোনও পরিকল্পনা নেই। রবিবার কাশ্মিরের গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা ও স্পর্শকাতর এলাকায় কঠোর বিধি-নিষেধ আরোপ করা হয়।

নিয়ন্ত্রণ রেখায় পাকিস্তানের সঙ্গে সহিংসতা বৃদ্ধি ও সন্ত্রাসী হামলার আশঙ্কার কথা উল্লেখ করে বহু স্থানে বন্ধ করে দেওয়া হয় মোবাইল ইন্টারনেট। বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে সেখানকার বিভিন্ন স্কুল ও কলেজ। কয়েকটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানকে ছাত্রাবাস খালি করে ফেলারও নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। কাশ্মির পুলিশের দাবি সতর্কতামূলক ব্যবস্থা হিসেবে এই পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। এদিন রাজ্য সরকারের এক নির্দেশনায় বলা হয় যেকোনও ধরণের সমাবেশ ও মিছিল নিষিদ্ধ থাকবে। তবে কোনও কোনও সংবাদমাধ্যমে কার্ফু জারির কথা বলা হলেও কোনও ধরণের কার্ফু জারি হয়নি বলে জানানো হয় ওই নির্দেশনায়। তবে রবিবার রাত থেকে শ্রীনগর জেলায় ১৪৪ ধারা কার্যকরের কথা জানিয়েছে রাজ্য সরকার।

উদ্ভূত পরিস্থিতিতে সাবেক মুখ্যমন্ত্রী মেহবুবা মুফতি, ওমর আবদুল্লাহ এবং রাজ্যের সব রাজনৈতিক দলের নেতারা রবিবার বৈঠকে বসেন। ওই বৈঠকের পর এক বিবৃতিতে কেন্দ্রীয় সরকারকে সতর্ক করে দেওয়া হয়। এতে বলা হয়, কাশ্মিরের বিশেষ অধিকার (সংবিধানের ৩৫ এ ধারা ও ৩৭০ অনুচ্ছেদ) বাতিল করা হলে সরকারকে পরিণাম ভোগ করতে হবে। ওই বিবৃতি প্রকাশের পর রবিবার রাত থেকে গৃহবন্দি করে রাখা হয় কাশ্মিরের গুরুত্বপূর্ণ রাজনীতিবিদদের।

এক টুইট বার্তায় সাবেক মুখ্যমন্ত্রী মেহবুবা মুফতি লেখেন, ‘কী পরিহাস যে আমাদের মতো নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি যারা শান্তির জন্য সংগ্রাম করেছে তাদের গৃহবন্দি করে রাখা হয়েছে। বিশ্ব দেখছে যে কাশ্মিরের মানুষ ও তাদের কণ্ঠস্বর স্তব্ধ করে রাখা হয়েছে’। আর ওমর আবদুল্লাহ লেখেন, ‘যা কিছুই ঘটুক আপনাদের সবার সঙ্গেই আমার দেখা হবে। আল্লাহ আমাদের রক্ষা করুন’।

এছাড়াও বেশ কয়েকজন রাজনীতিবিদকে আটক করা হয়েছে। ইন্ডিয়া টুডে’র খবরে কংগ্রেস নেতা উসমান মজিদ এবং সিপিআই (এম) নেতা এম ওয়াই তারিগামিকে মধ্যরাতে আটক করা হয়েছে। তবে সরকারি কর্তৃপক্ষ তাদের আটকের কথা স্বীকার করেনি।   এদিকে রবিবার দিল্লিতে শীর্ষ নিরাপত্তা ও গোয়েন্দা কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক করেছেন কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ।

ঘণ্টাব্যাপী ওই বৈঠকে জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা অজিত দোভাল, কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র সচিব রাজিব গাউবাসহ অন্যান্য ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন। এছাড়া সোমবার নিজের বাসভবনে মন্ত্রিসভার জরুরি বৈঠক ডেকেছেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। সকাল সাড়ে নয়টায় ওই বৈঠক শুরুর কথা রয়েছে।

প্রসঙ্গত, নিরাপত্তা পরিস্থিতির উন্নতির কথা বলে গত সপ্তাহে কাশ্মিরে আধা সামরিক বাহিনীর অতিরিক্ত ৩৫ হাজারেরও বেশি সদস্য মোতায়েন করে ভারত। কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, নিরাপত্তা বাহিনীর এসব বাড়তি সদস্যদের রাজ্যের রাজধানী শ্রীনগর এবং কাশ্মির উপত্যকার বিভিন্ন স্পর্শকাতর স্থানে মোতায়েন করা হয়েছে। সূত্র বাংলা ট্রিবিউন