কথা বলার মতো অবস্থাতে নেই, প্লিজ কিছু মনে করবেন না

স্টাফ রিপোর্টার:ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের সপ্তম তলার ডক্টরস রুম। দরজা ঠেলে ‍ঢুকতেই দেখা গেল চিকিৎসকের হাতে অনেকগুলো চিকিৎসাসংক্রান্ত কাগজপত্র, একের পর এক সেগুলো দেখে যাচ্ছেন তিনি। পাশে উদ্বিগ্ন মুখে দাঁড়িয়ে আছেন একজন, চিকিৎসকের প্রশ্নের জবাব দিচ্ছেন তিনি। কক্ষে ঢোকার অনুমতি চেয়ে নিজের পরিচয় দিয়ে কথা বলতে চাইতেই মুখ তুলে এই চিকিৎসক বললেন, ‘আমার এক রোগীর অবস্থা ভীষণ ক্রিটিক্যাল-কথা বলার মতো অবস্থাতে নেই, প্লিজ কিছু মনে করবেন না আপু’। নামটা জানা যাবে কিনা প্রশ্নে চোখ তুলে কেবল বললেন, ‘আমি অনারারি মেডিক্যাল অফিসার সেজুতি সরকার।’

কেবল এই চিকিৎসকই নন, ঈদের দিনে (১২ আগস্ট) ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের নতুন ভবনের পাঁচ, ছয় সাত এবং আট তলা ঘুরে চিকিৎসকদের এমনই ব্যস্ত সময় পার করতে দেখা গেছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক চিকিৎসক বলেন, সাধারণত বছরের দুই ঈদে মুসলিম চিকিৎসকদের ছুটি দিয়ে অন্য ধর্ম্বালম্বি চিকিৎসকদের ডিউটিতে রাখা হয়। কিন্তু এবারের ঈদে তার ব্যতিক্রম, চিকিৎসক-নার্সসহ সংশ্লিষ্ট কারও ক্ষেত্রে এবার সে নিয়ম রাখা হয়নি।

প্রসঙ্গত, এবারে ডেঙ্গু প্রাদুর্ভাবের কারণে গত ৩০ জুলাই স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের সব কর্মকর্তা-কর্মচারীসহ সবার ঈদের ছুটি বাতিল করা হয়।আজ সোমবার (১২ আগস্ট) ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে গিয়ে দেখা যায় হাসপাতালে যেমন রোগীর ভিড়, তেমনই চিকিৎসকদের কর্মব্যস্ততা। প্রতিটি ওয়ার্ডে চিকিৎসকসহ সংশ্লিষ্টরা কাজ করছেন, তবে চোখে পড়ার মতো ভিড় ছিল নতুন ভবনের যেখানে ডেঙ্গু রোগীদের চিকিৎসা চলছে।

ঈদের সময়ে সাধারণত মানবিক দিক দেখেই এতদিন মুসলিম চিকিৎসদের ছুটি দেওয়া হতো। কিন্তু এবারে ডেঙ্গু পরিস্থিতির জন্য কাউকে ছুটি দেওয়া হয়নি, সবার ছুটি বাতিল হয়েছে বলেন নতুন ভবনের সপ্তম তলায় কর্মরত সিনিয়র স্টাফ নার্স সোনিয়া আক্তার।বাংলা ট্রিবিউনকে সোনিয়া বলেন, ‘এর আগে কখনও এই অভিজ্ঞতা হয় না, বেসরকারি হাসপাতালেও কাজ করেছি। কিন্তু ঈদের দিনে এবারই প্রথম হাসপাতালে কাজ করছি।’

খারাপ লাগছে কিনা জানতে চাইলে সোনিয়া বলেন, ‘একেবারেই খারাপ লাগছে না। কারণ, হাসপাতালে রোগী মানেই অসহায়, তাদের তো আমরা ছাড়া আর কেউ নেই-এবারে এই উপলব্ধিটা হলো, যেটা আগে হয়নি।’ ‘যদিও ডেঙ্গুর কারণে ছুটি বাতিল হয়েছে কিন্তু মনে হচ্ছে যতদিন বেঁচে থাকবো ততোদিন ঈদের দিনে হাসপাতালে ডিউটি নিতে চেষ্টা করবো’, বলেন সোনিয়া আক্তার। কথা বলতে বলতেই সোনিয়া হাতে স্যালাইন আর ক্যানোলা নিয়ে ছুটলেন একটি বেডের দিকে। বলেন, ‘একটু দাঁড়ান আগে রোগীকে ম্যানেজ করে আসি।’
আবার ষষ্ঠ তলার পুরুষ মেডিসিন ওয়ার্ডে দায়িত্বরত ছিলেন ডা. রিমা আক্তার। চিকিৎসকদের নির্দিষ্ট বসার স্থানে তিনিসহ আরও চিকিৎসকরা একের পর এক রোগীর সঙ্গে কথা বলে যাচ্ছিলেন, রোগীর হিস্ট্রি নিচ্ছিলেন। কেউ বা আবার জটিল রোগী ট্রলিতে করে আসতেই ছুটে গেলেন সেদিকে। আগের সব কাগজ দেখছিলেন।

ঈদের দিনে ডিউটি করছেন, কেমন লাগছে জানতে চাইতে ডা. রিমা বলেন, ‘পরিবার ছেড়ে হাসপাতালে আছি, ডিউটি করছি। এতে আমাদের কিন্তু মন খারাপ হচ্ছে না, মন খারাপ হচ্ছে পরিবারের মানুষগুলোর। আমরা যেহেতু চিকিৎসক যে কোনও পরিস্থিতিতে আমাদের কাজ করতে হবে এটাই আমাদের ধর্ম, আমরা সে মানসিকতা নিয়েই এ পেশায় আছি, আমাদের পূর্বসূরীদেরও তাই দেখেছি।’
মানুষের সেবা করতে এসেছি আমরা, আমাদের হাত দিয়ে যদি একজন রোগীও আজ সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরতে পারে তাহলে সেটাই সবচেয়ে বড় ঈদের আনন্দ আমাদের, অনেক বড় পাওয়া। আজ মনে হচ্ছে ঈদের ছুটি গৌন হয়ে যাচ্ছে সব চিকিৎসকের কাছে বলেন তিনি।

ষষ্ঠ তলায় মেডিসিন বিভাগের ( পুরুষ) ৬০২ নাম্বার ওয়ার্ডে কাজ করছিলেন ডা. শাহরিয়ার সিদ্দিকী। বাংলা ট্রিবিউনকে তিনি বলেন, ‘ঈদের জন্য অনেকেই ঢাকা ছেড়েছেন। কিন্তু আমরা যে রকম ভর্তি ফেস করি (প্রতিদিন যে পরিমাণ রোগী হয়), সে তুলনায় আজ রোগীর সংখ্যা কিছুটা কম। তবে, তারপরও রোগী আসছে।’
সকালের শিফটে ডিউটি করেছেন আট জন আর বিকেলের শিফটে রয়েছেন নয় জন চিকিৎসক, জানান ডা. শাহরিয়ার। সমানভাবে অন্যরাও কাজ করছেন বলেন তিনি।
তবে কেবল ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল নয়, শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল, পঙ্গু হাসপাতাল, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়সহ বেসরকারি হাসপাতালগুলোতে সমানতালে চিকিৎসকরা কাজ করে গেছেন।

ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের বিভাগীয় প্রধান ডিপার্টমেন্ট অব নিউনেটাল সার্জারি ডিভিশন অব পেডিয়াট্রিক সার্জারির অধ্যাপক ডা. আব্দুল হানিফ টাবলু বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, আজ আমাদের শিশু সার্জারি বিভাগে ইমার্জেন্সি অস্ত্রোপচার হয়েছে, জেনারেল সার্জারি বিভাগে অস্ত্রোপচার হয়েছে, অনেকগুলো ডেলিভারি হয়েছে। ইমার্জেন্সি যা হয় তারচেয়ে বেশি হয়েছে আজ। কারণ, ঢাকার বাইরে ইমার্জেন্সি সার্ভিস ততো ভালো নাই, ফলে এমন রোগীরাও আজ ঢাকায় এসেছে, যার কারণে চাপটাও অনেক বেশি ছিল।
আমাদের রোস্টার ডিউটি ছিল, কিন্তু যেহেতু অনেক জুনিয়র চিকিৎসকই আজ ডিউটি করেছেন তাই সিনিয়র চিকিৎসক অনেকেই গিয়েছেন তাদেরকে উৎসাহিত করার জন্য এবং এটা দারুণভাবে কাজে দেয় বলেন অধ্যাপক ডা. আব্দুল হানিফ টাবলু।
চট্টগ্রাম বিভাগের বিভাগীয় স্বাস্থ্য পরিচালক ডা. হাসান শাহরিয়ার কবীর বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন,কোনও ধরনের অভিযোগ, ক্লান্তি ছাড়াই ঘণ্টার পর ঘণ্টা কাজ করে যাচ্ছেন আমাদের চিকিৎসকেরা। এসব চিকিৎসক আমাদের গর্ব, আমাদের সম্মান।  এই চিকিৎসক সমাজের জন্য আমি গর্ব করি, বলেন ডা. হাসান শাহরিয়ার কবীর।

সময়মতো ব্যবস্থা নিলে ডেঙ্গুর এই প্রাদুর্ভাব হতো না: মেনন

স্টাফ রিপোর্টার: বাংলাদেশের ওয়ার্কার্স পার্টির সভাপতি রাশেদ খান মেনন বলেছেন,

আমরা যদি সময়মতো ব্যবস্থা নিতাম তাহলে ডেঙ্গুর এই প্রাদুর্ভাব হতো না।

মঙ্গলবার (৬ আগস্ট) রাজধানীর আইডিয়াল স্কুল অ্যান্ড কলেজের সামনে ১৪ দল আয়োজিত সভায় সভাপতির বক্তৃতায় তিনি এ কথা বলেন।

তিনি বলেন, ডেঙ্গু নিয়ে যেমন আতঙ্কের কারণ নেই তেমনি ডেঙ্গু নিয়ে মিথ্যা আশ্বাস দেওয়াও ঠিক না।

ডেঙ্গুর ব্যাপারে আমাদের বছরব্যাপী কর্মসূচি গ্রহণ করতে হবে। এটা একদিনের ব্যাপার নয়।অনুষ্ঠানে আরও উপস্থিত ছিলেন,

দিলীপ বড়ুয়া, মোফাজ্জল হোসেন চৌধুরী মায়া, এজাজ আহমেদ মুক্তা, শিরিন আক্তার, ডা. শাহাদৎ হোসেন, নাদের চৌধুরী, এস কে শিকদার, রেজাউর রশিদ খান প্রমুখ।