আপা, আপনি নিউ মার্কেটেও আসেন! | সংবাদ

স্টাফ রিপোর্টার: ছোটবেলা আমার মনে হতো, ঈদের আলাদা একটা রঙ আছে। সেদিন আকাশটা থাকে একটু বেশি নীল, বাতাসে ভাসে নতুন গন্ধ। এ এমন এক দিন, যেদিনটা শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত কেবল আনন্দ আর আনন্দ। নতুন জামা, পোলাও-মাংসের গন্ধ, সকাল বেলার ঈদের নামাজ, ঈদ সালামি এই সবকিছুকে গায়ে মেখেই ঈদ।ঈদের আনন্দ শুরু হয় ঈদের বেশ কিছুদিন আগে থেকে। যদিও এবারের ঈদ তার খানিকটা ব্যতিক্রম। এই ঈদ এসেছে ডেঙ্গু মহামারি আর বন্যাকে সঙ্গী করে। শুধু যে ডেঙ্গুরই মহামারি হয়েছে তা-ই নয়, মহামারি রূপে এসেছে ধর্ষণ,এসেছে বিচার বহির্ভূত হত্যা,এসেছে গুজব রটিয়ে গণপিটুনিতে মানুষ মারা। চারপাশ ঘুরে একটা বিষয় এবার আমার কাছে খুব স্পষ্ট— এবারের ঈদ সাধারণ মানুষকে বিন্দুমাত্র স্পর্শ করেনি, অবশ্য উঁচু তলার মানুষের কথা ভিন্ন। চারপাশে শোক, আতঙ্ক আর অসহায় হতবিহ্বল মানুষ। এরমধ্যে ঈদ আর যা-ই হোক আনন্দ নিয়ে আসে না। তারপরও জীবন চলে,সমাজে যেহেতু বাস করি, তাই রক্ষা করতে হয় সামাজিকতাও। সে কারণেই অনেকটা বাধ্য হয়েই গিয়েছিলাম ঈদ প্রস্তুতি সারতে নিউ মার্কেটে।হাঁটতে হাঁটতে লক্ষ্য করলাম, কিছু মানুষ বিস্ময় ভরা চোখে দেখছে আমাকে। প্রথমে আমলে নেইনি। নানা কারণে মন বিক্ষিপ্ত, বাড়িতে অসুস্থ মা, চারপাশ থেকে আসছে প্রিয়জনদের ডেঙ্গু আক্রান্ত হওয়ার খবর। কিছু করার নেই,অসহায় হয়ে শোনা ছাড়া। সব মিলিয়ে কিছুটা ক্লান্ত বোধ করছিলাম, তাই বিশ্রাম নিতে বসেছিলাম বারান্দায় পেতে রাখা একটা ছোট টুলে। হঠাৎ এক ভদ্রলোক এগিয়ে এসে বিস্ময়মাখা গলায় বললেন— ‘আপনি রুমিন ফারহানা না?’ মাথা নাড়তেই তিনগুণ বিস্ময় নিয়ে বলে উঠলেন, ‘আপা, আপনি নিউ মার্কেটেও আসেন!’
এবার আমার বিস্ময়ের পালা। পাল্টা প্রশ্ন করলাম— ‘কেন, সমস্যা কোথায়?’

ভদ্রলোকের সহজ সরল স্বীকারোক্তি— ‘ভেবেছিলাম দেশে কেনাকাটা করলে আপনারা গুলশান, বনানী থেকেই করেন।’ 
এই উত্তরে আর অবাক হইনি। কারণ, এ ধরনের আরেকটি উক্তির মুখোমুখি আমাকে প্রায়ই হতে হয়— ‘আপার বাসা তো নিশ্চয়ই গুলশানে’।
বাসা নিয়ে এই মন্তব্য যখনই শুনি, তখনই একটা পারিবারিক পুরনো স্মৃতি আমার মনে জেগে ওঠে। ২০০০ সালের দিকে আমার মা তাঁর জমি বিক্রির টাকায় গুলশানে একটা ফ্ল্যাট বুকিং দিয়েছিলেন। সেই সময় গুলশানের ফ্ল্যাট মধ্যবিত্তের একেবারে নাগালের বাইরে ছিল না। আমার বাবা অলি আহাদ সাহেব মায়ের এই সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছিলেন এই যুক্তিতে যে, গুলাশানের মতো ক্লাবপাড়া কখনও কোনও রাজনীতিবিদের আবাসস্থল হতে পারে না। তাঁর শক্ত অবস্থান আমার মাকে তাঁর সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসতে বাধ্য করে। তিনি ফ্ল্যাট বুকিং বাতিল করেন। কারও কারও কাছে এই কথাগুলো রূপকথার মতো শোনাতে পারে, কিন্তু এটাই আমার জীবন, এভাবেই আমি বেড়ে উঠেছি।  

আমার বাবা কিছু আপ্ত বাক্য মানতেন, মনেপ্রাণে বিশ্বাস করতেন, ধারণ করতেন এবং সেই অনুযায়ী চলতেন। ‘Plain living high thinking’ যার অন্যতম। আমাদের বাসায় ফ্রিজ বা টেলিভিশনের মতো অতি প্রয়োজনীয় সামগ্রীও ঢুকেছে অনেক পরে। আমার মা মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অধিদফতরের প্রথম মহিলা মহাপরিচালক ছিলেন এবং এই যাবতীয় ব্যয় তিনিই নির্বাহ করতেন। তারপরও বাবার এই দর্শনকে শ্রদ্ধা জানিয়ে মেনে নিয়েছিলেন তাঁর সিদ্ধান্ত। বন্ধুরা গল্প করতো কার্টুন ছবি বা কোনও নাটকের, অবাক বিস্ময়ে শুনতাম আমি। তাই পরবর্তীতে আমাদের বাসায় এসব এসেছিল আমার চাপে, যখন আমি স্কুলের শেষের দিকে।
রাজনৈতিক পরিবারে জন্মের সূত্রে শৈশব থেকেই বিভিন্ন রাজনীতিবিদ ও তাদের পরিবারের সঙ্গে আমাদের ওঠাবসা। আমাদের পরিবারের মতো আদর্শিক বাতিকগ্রস্ততা না থাকলেও, তখনকার রাজনীতিবিদরা আজকের মতো এত বীভৎস রকম চাকচিক্যময় জীবনযাপনে অভ্যস্ত হয়ে ওঠেননি, কিছুটা চক্ষুলজ্জা তখনও ছিল।  এখন তো মন্ত্রী-এমপি বাদই দিলাম, বড় দুই দলের থানা বা ওয়ার্ড পর্যায়ের কোনও নেতার বাড়িতে গেলে ভিরমি খেতে হয়। আমি এখন ব্যবসায়ী আর রাজনীতিবিদ আলাদা করতে পারি না, তারা একে অন্যে বিলীন। সৎ এবং অনাড়ম্বর জীবনযাপন করা রাজনীতিবিদ এই সময়ের বাংলাদেশে এক বিলুপ্তপ্রায় প্রজাতি।

বাংলাদেশের রাজনীতি এখন দুই ধরনের ব্যাধিতে আক্রান্ত— এক. অসততা, ও দুই. লোক দেখানো আড়ম্বর। অথচ আমাদের পাশের দেশ ভারতে বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য, মানিক সরকার, নবীন পাট্টনায়েক, ড. থমাস আইজ্যাক, কুমার বিশ্বাসের মতো সৎ এবং সাদাসিধে জীবনযাপনকারী রাজনীতিবিদ অনেক আছেন। পাশ্চাত্যে বেশির ভাগ রাজনীতিবিদ সৎ এবং সহজ-সাধারণ জীবনযাপনে অভ্যস্ত। ডেভিড ক্যামেরন মেট্রোর দেয়ালে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে ম্যাগাজিন পড়ছেন, বারাক ওবামা রেস্টুরেন্টের কিউতে অপেক্ষা করছেন, অ্যাঙ্গেলা মেরকেল বাচ্চাদের সঙ্গে রাস্তা পার হচ্ছেন, সিনিয়র সিটিজেনদের সঙ্গে জাস্টিন ট্রুডো হাঁটু গেঁড়ে কথা বলছেন (এই ছবিটি কিছুদিন আগে আমাদের দেশে ভাইরাল হয়েছিল)— এমন আরও অনেক দৃশ্য আমাদের সামনে হরহামেশাই আসে। যেসব দেশে সরকার প্রধানরা এমন জীবনযাপন করেন, সেসব দেশের মন্ত্রী-এমপিদের কথা বলাই বাহুল্য।
আগেই যেমনটি বলেছিলাম, এই পোড়ার দেশে রাজনীতিবিদ আর ব্যবসায়ী আলাদা করা কঠিন। ব্যবসায়ীদের অনেক দেখনদারী থাকে, বাজারের সবচেয়ে দামি গাড়ি, বাড়ি, বউয়ের শাড়ি কে কতটি কিনতে এবং দেখাতে পারছেন, তা নিয়ে একটা চাপা প্রতিযোগিতা ব্যবসায়ীরা করবেন সেটাই স্বাভাবিক। কারণ, সেটাই সাফল্য পরিমাপের মাপকাঠি। বাংলাদেশে বসে তারা ওয়ারেন বাফেট, বিল গেটস, জর্জ সোরস, এমনকি জামসেদজি টাটাদের মতো জনকল্যাণকর কাজে নিজের সম্পদের বড় অংশ ব্যয় করবেন, সেই আশা আমরা করি না। কিন্তু যখন একজন রাজনীতিবিদ কোটি টাকার বাংলোতে বসে, বিএমডব্লিউ, বেন্টলি, মার্সেডিজ, রেঞ্জ রোভার, অডির কালেকশন শো করেন, ঈদ আসলে দেশে-বিদেশে তথাকথিত ব্র্যান্ডের দোকানের জিনিস কিনে ইজ্জত সামলান, কোরবানির ঈদ আসলে যাদের কাছে ৩০ থেকে ৪০ লাখ টাকার বস, প্রিন্স, টাইটানিক, মেসি, যুবরাজ, কালা চাঁদ, খান বাহাদুর বিক্রি হয়, কিংবা যারা মনে করেন শ’ খানেক গরু কোরবানি না দিলে ঈদটাই মাটি, তখন তাদের কাছে দেশের আসলে খুব বেশি প্রত্যশার কিছু থাকে না।
একের পর এক রাজনীতিবিদ এই দলে নাম লেখানোতে মানুষ এখন ধরেই নেয় রাজনীতিবিদ মাত্রই ওপরে লেখা বৈশিষ্ট্যগুলো থাকবেই। সে কারণেই আমার শৈশব থেকে বেড়ে ওঠা পর্যন্ত, বই থেকে বাজার সবকিছুর যোগানদার নিউ মার্কেটে আমাকে দেখে বিস্মিত মানুষের বিস্ময়— আমাকে আর বিস্মিত করে না। সমাজ গঠন, এর পরিবর্তন, সংস্কার এই সবকিছুতেই মুখ্য ভূমিকা পালন করেন রাজনীতিবিদরা। সুতরাং তাদের নৈতিক স্খলন শুধুমাত্র তাদের একার স্খলন নয়, এর প্রভাব পড়ে পুরো সমাজেই। 

একটা দেশের রাজনীতিবিদরা আসলেই যেমন হওয়া দরকার, তার ভুরি ভুরি উদাহরণ এই পৃথিবীতে বর্তমান থাকলেও, আমাদের বর্তমান বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে সেটাকে অতি ইউটোপিয়ান চিন্তা বলে মনে হয়। এরশাদের পতনের পর বাংলাদেশে গণতান্ত্রিক ধারা আবারও চালু হবার পর নব্বইয়ের দশকেও রাজনীতির পরিস্থিতি এতটা খারাপ ছিল না। সবচেয়ে আশঙ্কার বিষয়, সময়ের সঙ্গে পরিস্থিতি ক্রমাগত আরও খারাপ হচ্ছে। যেহেতু রাজনীতিই সব কিছুর চালিকাশক্তি, তাই রাজনীতির এই অধঃপতনের সঙ্গে সঙ্গে অধঃপতিত হচ্ছে এই রাষ্ট্রের সব সিস্টেম ও ইনস্টিটিউট। এই রাষ্ট্রের সব সিস্টেম একেবারে ভেঙে পড়ে পুরোপুরি ব্যর্থ রাষ্ট্রে পরিণত হওয়ার খুব কাছাকাছি আছি আমরা।
চীনে বিপ্লব পরবর্তী সময়ে প্রথমে ‘Great Leap Forward’ এর নামে চার বছরে এবং এরপর ‘Cultural Revolution’ এর নামে প্রায় এক দশক ধরে যেভাবে রাতারাতি সমাজ ব্যবস্থা পাল্টে ফেলার চেষ্টা হয়েছিল, তার ফলাফল হয়েছিল বীভৎস।  ‘Great Leap Forward’ এর সময় চীনের মহাদুর্ভিক্ষে সরকারি হিসাবেই মৃত্যুর সংখ্যা হয়েছিল দেড় কোটি (কিছু গুরুত্বপূর্ণ গবেষণায় এই সংখ্যা সাড়ে চার কোটি পর্যন্ত)। আর ‘Cultural Revolution’ সময় নানা কারণে মৃত্যুর সংখ্যা প্রায় দুই কোটি। সমাজতান্ত্রিক শাসন ব্যবস্থা একটা রাষ্ট্রের মানুষের সত্যিই কল্যাণ নিয়ে আসতে পারে কিনা, কিংবা এমন শাসন ব্যবস্থা আসলেই প্র্যাগম্যাটিক চিন্তা কিনা, সেই বিতর্ক দূরে সরিয়ে রেখেও বলা যায়, দীর্ঘদিন চালু থাকা একটা সিস্টেম (সেটা এমনকি বাজে হলেও) রাতারাতি পাল্টে ফেলে নতুন সিস্টেম চালু করার চেষ্টা, বেশিরভাগ সময় ভালো ফল দেয় না। বরং সেই চেষ্টা ভয়ঙ্কর বিপদের সম্ভাবনা তৈরি করে।
দশকের পর দশক ধরে এই রাষ্ট্রের প্রতিটি রাজনৈতিক দলের সামষ্টিক ব্যর্থতায় আমাদের রাজনীতি আজ যে জায়গায় এসে দাঁড়িয়েছে, সেটাকে রাতারাতি পাল্টে ফেলা যাবে সেটা যেমন আমি মনে করি না, তেমনি সেই চেষ্টা বিপদ তৈরির সম্ভাবনাও তৈরি করতে পারে। কিন্তু এটা নিয়ে কোনও দ্বিমত নেই, বাংলাদেশের রাজনীতিবিদরা যে পথে হাঁটছেন, সেটাকে এখনই যদি বন্ধ করে তাদের গতিপথ একেবারে উল্টে দেওয়া না যায়, তাহলে আমাদের সামনে ভয়ঙ্কর বিপদ অপেক্ষা করছে।

এই স্খলনের চাকাটা উল্টো ঘুরিয়ে দেওয়ার সময় এবং সেটাকে ধীরে হলেও উল্টো দিকে চালিত করার সময় এখনই। সেটা যদি করতে পারি, তাহলে কয়েক বছর পরই হয়তো দেখা যাবে, কয়েকজন গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক নেতা, এমপি, মন্ত্রী নিউ মার্কেটে শপিং করতে গিয়ে নিজেদের মধ্যে দেখা হওয়ায় আড্ডা দিচ্ছেন। সেটা দেখে মানুষ চোখ কপালে তো তুলছেই না, বরং তারাও সেই আড্ডা শুনছেন, যোগ দিচ্ছেন আড্ডায়। সেই বাংলাদেশে ‘সিনিয়র সিটিজেনদের সঙ্গে জাস্টিন ট্রুডো হাঁটু গেঁড়ে কথা বলছেন’ এরকম ছবি আর ভাইরাল হবে না।
লেখক: আইনজীবী, সুপ্রিম কোর্ট। জাতীয় সংসদের সংরক্ষিত আসনে বিএনপি দলীয় সংসদ সদস্য সূত্র বাংলা ট্রিবিউন